জাগো নারী জাগো বনহিশিখা

Posted by

·

“জাহাঙ্গীরনগরের মেয়েদের বিয়ে হয় না। এরা সারারাত বাইরে ঘুরাঘুরি করে।”

একটি রেকর্ডে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ফরিদ উদ্দীন আহমেদকে উপরোক্ত কথাগুলো বলতে শোনা যায়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের এরকম জঘন্য, নারীবিদ্বেষী, অবমাননাকর ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য শুনলেই আঁচ করা যায় আমাদের সমাজ এবং রাষ্ট্রের নারীদের নিয়ে ভাবনা ঠিক কেমন! আমরা দেখি, “ভালো মেয়েরা রাত দশটার পর ঘরের বাইরে থাকে না” এই ভাবনায় রাতের বেলা যেকোনো প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে বের হলেও নারীর চরিত্রের ওপর প্রশ্ন তোলা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।

রাষ্ট্র এবং সমাজে প্রতিনিয়ত নারীদের ওপর নানা অত্যাচার, নিপীড়নের পাশাপাশি আমরা দেখি, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েও আদতে নারী-পুরুষ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্য রয়েছে। ছাত্রদের হলে প্রবেশের নির্দিষ্ট কোনো সময় বাঁধা না থাকলেও, আমাদের ছাত্রীদের হলে প্রবেশের নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কোনো কারণে এ নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেলে পরবর্তীতে একজন ছাত্রীকে কারণ দেখাতে হয় অথবা তিনি এতোক্ষণ কোথায় ছিলেন- সে বিষয়টি উল্লেখ করতে হয়; যেটি ছাত্রদের ক্ষেত্রে আমরা কখনোই দেখি না।

আমরা সম্প্রতি দেখেছি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম খালেদা জিয়া হলে ছাত্রীদের কাছে একটি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। যেখানে লিখা, অমিক্রনের প্রাদুর্ভাবের কারণে রাত ১০ টার মধ্যে ছাত্রীদের হলে ফিরতে হবে। কী হাস্যকর হল প্রশাসনের চিন্তাভাবনা! রাত ১০ টার পর অমিক্রনের সংক্রমণ বেশি হয় কি না আর সেটি শুধু ছাত্রীদেরই হয় কি না- এব্যাপারে হল প্রশাসনের ভাবনা পরিষ্কার করা প্রয়োজন। আমরা একইসাথে দেখেছি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নির্দিষ্ট হলে যেসকল ছাত্রীদের রাতে হলে ফিরতে দেরী হয়, তাদের চিহ্নিত করে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে এবং হুমকি দেওয়া হয়েছে, রাতে দেরি করে হলে ফেরা অব্যাহত রাখলে অভিভাবকদের জানানো হবে!

আমরা বিশ্বাস করি, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ হিসেবে ছাত্রীরা উপযুক্ত কারণ ছাড়া কখন, কোথায়, কী কাজে ছিলো সেই বিষয়ে কারও কাছে জবাবদিহিতা করতে বাধ্য নয়। উপরন্তু, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের হলে এধরণের কোনো নিয়মের প্রয়োগ দেখা যায় না, সেখানে ছাত্রী হলে এই নিয়মের প্রয়োগ হয়রানি ছাড়া আর কিছুই নয়।

আমরা জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীরা মনে করি, এইসকল হয়রানির সমুচিত জবাব দেওয়ার সময় এসেছে। শাবিপ্রবি’র উপাচার্যের এই জঘন্য বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন মহল থেকে প্রতিবাদ এবং বিবৃতি দেওয়া হলেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন এখনও পর্যন্ত স্পষ্টত প্রতিবাদ এবং পদক্ষেপ নেয়নি। যেখানে সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগে হরহামেশা মামলা হতে দেখা যায়, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের নিয়ে এরকম কুরুচিপূর্ণ এবং অবমাননাকর কথা বলার পরও কেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় নি, এব্যাপারে জবাবদিহিতা অত্যন্ত প্রয়োজন।

তাই, আমরা যারা ছাত্রী হলের শিক্ষার্থী এবং প্রতক্ষ্যভাবে হয়রানি ও বৈষম্যের শিকার তাদের উদ্যোগে আগামীকাল আয়োজিত হতে যাচ্ছে “জাগো নারী, জাগো বহ্নিশিখা!”

কী কী থাকছে?
★ জাবি, চোখ খোলো!
আগামীকাল, ২২ জানুয়ারী, শনিবার বিকেল ৩ টায় শহীদ মিনারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের অভিজ্ঞতালব্ধ সকলের অংশগ্রহণে একটি উন্মুক্ত প্রদর্শনী হবে, যেখানে আমরা জানতে পারবো জাহাঙ্গীরনগরের মতো একটি বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্র-ছাত্রী বৈষম্যের আকার এবং বিস্তার কতো তীব্র।

আপনার অভিজ্ঞতা জানাতে নিম্নের গুগল ফর্মটি পূরণ করে ফেলুন:

★ প্রতীকী অনশন

শাবিপ্রবি’র শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সাথে একাত্মতা পোষণ করে প্রতীকী অনশন।
সময়: বিকেল ৩:১৫ মিনিট
স্থান: শহীদ মিনার

★ প্রাচীর ভেঙে মুক্ত হই!
আগামীকাল, ২২ জানুয়ারী, শনিবার রাত ১০:৩০ মিনিটে মশাল মিছিল।
যাত্রাপথ: বঙ্গমাতা হল থেকে শহীদ মিনার।

আমাদের দাবী:

১. অবিলম্বে শাবিপ্রবি’র উপাচার্যের বক্তব্যের প্রতিবাদে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিবৃতি প্রদান করতে হবে।

২. শাবিপ্রবি’র উপাচার্যকে পদত্যাগ করতে হবে এবং তার বক্তব্যের জন্য জনসম্মুখে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে হবে।

৩. জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলগুলোতে হয়রানি বন্ধ করতে হবে।

কেন এই মিছিল রাত ১০:৩০ মিনিটে?

শাবিপ্রবি’র উপাচার্য যেহেতু রাতের বেলা বাইরে থাকার প্রসঙ্গ নিয়েই জাহাঙ্গীরনগরের ছাত্রীদের অবমাননা করেন, তাই আমরা রাতের বেলা মিছিল করেই বুঝিয়ে দিতে চাই যে একটি বিশ্ববিদ্যালয় ঠিক যতোটা একজন ছাত্রের, ততোটাই একজন ছাত্রীরও। ক্যাম্পাসে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে, কাজে-আড্ডায় রাতে বাইরে থাকা দিয়ে একজন নারীর চরিত্রে কালিমা লেপন করা বন্ধ করতে হবে। শাবিপ্রবি’র উপাচার্যের এই জঘন্য বক্তব্যের প্রতিবাদ আমরা আমাদের ক্যাম্পাসে নির্ভীক হয়ে করবো, রাতের বেলাই!

সকলকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মাস্ক এবং স্যানিটাইজার নিয়ে আসার জন্য অনুরোধ করা হলো।

আসুন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেখিয়ে দিই, “বিবাহযোগ্যা” হয়ে উঠার তাড়না জাহাঙ্গীরনগরের ছাত্রীদের তো নেই-ই; বরং আমাদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি লৈঙ্গিক পরিচয়ের কারণে হয়রানি করলে আমরা দ্বিগুণ তেজে জ্বলে উঠতে জানি।