লিখেছেন নাফিসা নিপুণ তানজীম
বাংলাদেশের রাজনৈতিক কমেন্টেটর ও ইনফ্লুয়েন্সারের ইতিহাসে পিনাকী ভট্টাচার্য একটা ফেনোমেনন। ডাক্তারি পড়াশোনা করে বামপন্থী রাজনীতিতে জড়িত হয়েছিলেন তিনি। এখন শাহবাগের সংশ্লিষ্টতা থেকে জামায়াত-এনসিপির বিশাল মুখপাত্রে পরিণত হয়েছেন। বামপন্থী-ডানপন্থী রাজনৈতিক চিন্তাধারার এক অদ্ভুতুরে খিচুড়ি হলো পিনাকী, যার ইউটিউব চ্যানেলে চল্লিশ লাখের বেশি সাবস্ক্রাইবার। Like him or hate him, you need to take him seriously. কেন বলছি পিনাকীকে সিরিয়াসলি নেয়া দরকার?
অনেকের কাছে পিনাকীর কথা-বার্তা মূলত প্রোপাগান্ডা লাগলেও তার চল্লিশ লাখ সাবস্ক্রাইবারের একটি বড় অংশের রাজনৈতিক চিন্তা-ভাবনা এবং অবস্থান নির্ভর করে পিনাকী কী বলছেন তার ওপরে। আমাদের মা-বাবার জেনারেশান থেকে শুরু করে জেন-যি পর্যন্ত মিলে পিনাকীর বিশাল সংখ্যক ফলোয়ার। অনেক আন্টি-আংকেলের সাথে কথা বলতে গিয়ে দেখছি, ওনারা জাস্ট পিনাকীর টকিং পয়েন্ট আউড়াচ্ছেন। আর জেন-যির মধ্যে পিনাকীকে গুরু মানা জনগোষ্ঠীও রীতিমত বিশাল। একটা দেশের রাজনৈতিক ন্যারেটিভ তৈরি করার ক্ষমতা পিনাকী তার পপুলিস্ট রেটোরিক দিয়ে ক্যাপচার করে ফেলেছেন।
আমাদের তাই দেখা দরকার ঠিক কী কী স্ট্র্যাটেজি দিয়ে পিনাকী তার পপুলিস্ট রেটোরিক তৈরি করছেন? কোন স্ট্র্যাটেজিগুলো এরূপ পপুলিস্ট রেটোরিক তৈরি করার ক্ষেত্রে খুব এফেক্টিভ?
প্রথমেই ছোট আলোচনা করে নেই — পপুলিজম মানে কী? পপুলিজম একটা রাজনৈতিক ভাবধারা যার মূল বক্তব্য হলো – একটা এলিট এস্টাবলিশমেন্ট জনতার স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছে। পপুলিজম জনতাকে এলিট এস্টাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে দাঁড় করায় এবং ক্ষমতাশালীদের বিরুদ্ধে লড়াই করার আহবান জানায়। পপুলিস্টরা বামপন্থী হতে পারে, ডানপন্থীও হতে পারে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে বার্নি স্যান্ডার্স, আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও কর্তেজ, যোহরান মামদানি – এরা সবাই বামপন্থী পপুলিস্ট পলিটিক্স করেন। বামপন্থী পপুলিস্টরা কর্পোরেট শোষণের কথা বলে। কীভাবে বিলিয়ন ডলারের বড় বড় কর্পোরেশন সাধারণ শ্রমজীবি মানুষকে জিম্মি করে মুনাফা কুক্ষিগত করে, তার সমালোচনা করে।
ডানপন্থী পপুলিস্টরা সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে তাদেরকে, যারা “আদার” — অভিবাসী, রিফিউজি, অশ্বেতাঙ্গ মানুষ। ব্রাজিলের বলসোনারো, ভারতের নরেন্দ্র মোদি, হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবান এবং যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প — এরা সবাই ডানপন্থী পপুলিস্ট রাজনীতি করেন। নরেন্দ্র মোদী ঘুরেফিরে বারবার মুসলিমদের সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ট্রাম্প মোটামুটি যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্র্যান্ট, রিফিউজি আর মুসলিমদের বিরুদ্ধে। ডানপন্থী পপুলিজম অনেকসময় ভীষণরকমের জাতীয়তাবাদীর রূপ নেয়। ডানপন্থী পপুলিস্টরা কখনো বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে কথা বলে। কখনো তারা পরিবেশ সুরক্ষা সংক্রান্ত বিধি-নিষেধের সমালোচনা করে। এখন বামপন্থীরাও কিন্তু বিশ্বায়নের বড় সমালোচক। এই কারণেই যেটা প্রায় হয়, সেটা হলো — বাম আর ডানপন্থী পপুলিজমের পার্থক্যটা সবসময় সুষ্পষ্ট থাকে না। মাঝে মধ্যেই ডানপন্থী পপুলিস্টরা বামপন্থার কিছু এলিমেন্ট নিয়ে তাদের যুক্তি দাঁড় করায়। হঠাৎ করে শুনলে মনে হবে বামপন্থী কেউ কথা বলছে — কিন্তু আসলে তার রাজনীতি ভীষণরকমে ডানপন্থী। পিনাকী হলেন এর পারফেক্ট উদাহরণ।
পিনাকীর কোন কোন কৌশলগুলো তাকে ব্যাপক সংখ্যক ফলোয়ার রিচ করতে এবং তাদের রাজনৈতিক চিন্তা-ভাবনাকে প্রভাবিত করতে সাহায্য করছে? আমি পিনাকী স্পেশালিস্ট না, আমি তার সব বক্তব্য শুনিওনি। আমি এই লেখায় তার একটা ভিডিও — “ভোটের আগেই খেলা শেষ: ফ্রন্ট জিতবে কোন প্ল্যানে” — ব্যবহার করে তার যোগাযোগের কৌশলগুলো বিশ্লেষণ করবো।
স্ট্র্যাটেজি এক: অপ্রমিত ভাষা, কমেডি এবং স্ল্যাং-এর ব্যবহার
বাংলাদেশে আঞ্চলিক ভাষা এবং কমেডি ব্যবহার করে পলিটিক্যাল কমেন্টেরি করার ট্র্যাডিশন সম্ভবত শুরু করেছিলেন এম. আর. আখতার মুকুল। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ছিল চরমপত্র। ১৯৭১ সালের ২৫শে মে থেকে শুরু করে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮-১০ মিনিটের এই টেইপগুলো নিয়মিত প্রচার করা হতো। মানুষ যুদ্ধের হাজারো অনিশ্চয়তার মাঝেও সময় করে সেগুলো শুনতো। চরমপত্র শুনে তারা দুঃখ-হতাশা-চিন্তার মাঝেও হাসতো, তথ্য পেতো, উদ্দীপিত হতো।
পিনাকীর ইউটিউব চ্যানেলের ভাষা অপ্রমিত। আমি বলবো, পিনাকীর প্রমিত, “স্ট্যান্ডার্ড” বাংলা ত্যাগ করে অপ্রমিত বাংলা বেছে নেয়ার সিদ্ধান্তটা খুবই ক্যালকুলেটেড একটা সিদ্ধান্ত। অপ্রমিত বাংলার ব্যবহার ফলোয়ারদের মেসেজ দেয় যে পিনাকী এলিট রাজনীতি করেন না। এই ব্যবহার তার ফলোয়ারদের মাঝে বিশ্বাস তৈরি করে যে যেহেতু পিনাকীর ভাষা আমজনতার ভাষার মতই, সুতরাং তার রাজনীতিও নিশ্চয়ই আমজনতার স্বার্থকে সবার আগে রাখবে।
অপ্রমিত ভাষার সাথে কিছুক্ষণ পরপর হিউমার, কমেডি আর অত্যন্ত সেক্সিস্ট স্ল্যাং-এর মিশেল পিনাকীর রাজনৈতিক বিশ্লেষণকে খুব উপাদেয় বস্তু হিসেবে ব্যাপকসংখ্যক ফলোয়ারদের কাছে পৌঁছে দেয়। সেক্সিস্ট স্ল্যাং সেলস। পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা-ভাবনা যে সমাজে ভীষণভাবে প্রভাবশালী, সেই সমাজে পুরুষতান্ত্রিক হাস্যরস মেশানো রাজনৈতিক আলোচনা মানুষ যে অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে খাবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
স্ট্র্যাটেজি দুই: বুদ্ধিবৃত্তিকতাবিরোধী অবস্থান
পিনাকীর আলোচনায় বারবার তার বুদ্ধিবৃত্তিকতাবিরোধী অবস্থান উঠে এসেছে। যেমন “ভোটের আগেই খেলা শেষ: ফ্রন্ট জিতবে কোন প্ল্যানে” – এই ভিডিওতে এনসিপির নারী নেতারা জামায়াতে ইসলামীর সাথে এনসিপির সমঝতা করা নিয়ে যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান, তার সমালোচনা করে পিনাকী বলেন, “এনসিপির কিছু নারী নেতৃত্ব আখেরি ঝামেলা তৈরি করলো।” পিনাকীর মতে “জাতীয় ইস্যু নিয়ে” কাজ করার সময় “হুদাই কিছু আজাইরা ইস্যু নিয়ে” ঝামেলা তৈরি করে এনসিপির নারী নেতারা পুরো প্রসেসকে বাগড়া দিয়ে নষ্ট করার চেষ্টা করছেন।
পিনাকীর মতে ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে রাজপথে না নামার পরেও “চালাকচতুর মানুষদের উচ্চপদে বসালে কী পরিণতি হয়, সেটা এনসিপি হাড়ে হাড়ে টের” পাচ্ছে। ইঙ্গিতটা সম্ভবত তাসনীম জারার মত মানুষদেরকে করা — কারণ জারা ঢাকার ভিকারুননিসা, ঢাকা মেডিকেল থেকে পাশ করে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স শেষ করে যুক্তরাজ্যের প্রেস্টিজিয়াস চাকরি ছেড়ে বাংলাদেশের পলিটিক্সে ঢুকেছেন। “উচ্চশিক্ষিত মানুষ না আসলে” রাজনীতির বারোটা বাজবে – পিনাকী এই অবস্থানের বিরোধিতা করেন। একেবারে খাস বামপন্থী ভাষা ব্যবহার করে পিনাকী বলেন যে রাজনীতি কর্পোরেট জব না, রাজনীতি ইউনিভার্সিটির মাস্টারি না, রাজনীতি ডাক্তারি–ইঞ্জিনিয়ারিং না এবং উচ্চশিক্ষা রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার বিকল্প না। পিনাকীর মতে রাজনৈতিক বৈধতা আসে জনগণের সাথে লড়াই করে, ত্যাগ করে, ঝুঁকি নিয়ে। “আপনি জ্ঞানে আকাশে উঠে গেছেন, কিন্তু আপনার মানুষ আছে মাটিতে” — এটা পিনাকীর মতে সমস্যাজনক। তিনি বলেন, রাজনীতিবিদদের মাটির কথা বলতে হবে। তিনি ভারতের সাবেক প্রাইম মিনিস্টার মনমোহন সিং কীভাবে অক্সফোর্ড-কেমব্রিজের ডিগ্রি থাকার পরও “এলিট কনসেনসাস”-এর অংশ হয়ে এলিট গোষ্ঠীর রাজনীতি করে গেছে তার সমালোচনা করেন। উচ্চশিক্ষিত প্রফেসর ইউনুসের দুর্বল ইনটেরিম সরকারেরও সমালোচনা করে্ন পিনাকী। পিনাকী আপাত দৃষ্টিতে বরাবরই “এলিট” এবং “টেকনোক্র্যাট” রাজনৈতিক সরকারের বিরোধী।
আমি বলবো, পিনাকীর কথা-বার্তা ভীষণ বামপন্থী, এলিট-টেকনোক্র্যাটবিরোধী, নন-এলিট মানুষের পক্ষে শোনালেও এর মধ্যে একটা শক্ত ডানপন্থী উদ্দেশ্য আছে। কেন বলছি এটা? যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকাই। যুক্তরাষ্ট্রের চরম ডানপন্থী ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় ফলোয়ার কারা? ইউনিভার্সিটির ড্রিগ্রি না থাকা সাদারা। ট্রাম্প উল্টা-পাল্টা, ভুল-ভাল এবং অনেকসময় মিথ্যা রেফারেন্স দিয়ে যা বলেন, সেগুলোর গলদ বোঝার মত বুদ্ধিবৃত্তিক ট্রেনিং এই হাই স্কুল পাশ সাদাদের নেই। ট্রাম্প যখন অপরাধ আর অর্থনৈতিক সমস্যার পুরো দায় চাপায় ইমিগ্র্যান্টদের ওপরে, ক্রিটিক্যাল থিংকিং-এর ট্রেনিং না পাওয়া সাদারা বুঝতে পারে না যে জব ইমিগ্র্যান্টরা চুরি করছে না, বরং আমেরিকার বড় কর্পোরেশানগুলো নিজেদের লভ্যাংশ বাড়ানোর জন্য জবগুলো সস্তা শ্রমের দেশে আউটসোর্স করছে অথবা এই আই দিয়ে রিপ্লেস করছে। আমেরিকার সমস্যা হলো উৎপাদনের দিকে নজর না দিয়ে শেয়ার মার্কেটকে প্রায়োরিটাইজ করা, শ্রমিকের স্বার্থ না দেখে পুঁজির স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়া এবং দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক বিনিয়োগ না করে স্বল্পমেয়াদী অর্থনৈতিক বিনিয়োগ করা। এগুলো বোঝার জন্য বেসিক অর্থনীতির জ্ঞান থাকতে হয়।
এখন জ্ঞানের জন্য কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে পড়তেই হবে এমন কোন কথা নাই। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই শুধু বই পড়ে বা ভালো চ্যানেল দেখে এই জ্ঞান আহরণ করা সম্ভব। কিন্তু পরিসংখ্যানগতভাবে ইউনিভার্সিটিতে অন্তত একটা আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি নিলে এই বিষয়গুলোর সম্ভাবনা বাড়ে। আবার অনেক উচ্চশিক্ষিত ট্রাম্প ভোটারও আছেন যারা হিসাব কষে দেখেছেন ট্রাম্প ক্ষমতায় আসলে তাদের ট্যাক্স কম দিতে হবে অথবা তাদের মালিকানাধীন কর্পোরেশান অনেক লাভ করতে পারবে। তবে আমেরিকার ইউনিভার্সিটিগুলো কিছুটা হলেও শিক্ষার্থীদের ক্রিটিক্যাল থিংকিং শেখানোর চেষ্টা করে। সেটাই ডোনাল্ড ট্রাম্পদের মত ডানপন্থী পপুলিস্ট রাজনৈতিকদের জন্য একটা ভয়ের ব্যাপার। মানুষজন বেশি বোঝা শুরু করলেতো তাদেরকে আর আবজাব বুঝিয়ে ধোঁকা দেয়া যাবে না। এই কারণেই ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে আমেরিকার ইউনিভার্সিটিগুলোকে নানারকম ভয় দেখিয়ে, ফান্ডিং কাটার থ্রেট দিয়ে বশে আনার চেষ্টা করছে।
আমি বলবো পিনাকীর মত ডানপন্থী পপুলিস্টদেরও ভয় হলো শিক্ষিত এবং প্রগতিশীল মানুষেরা যারা পিনাকীদের যুক্তির ফাঁকগুলো খপ করে ধরে ফেলবে। এই কারণেই শিক্ষিত প্রগতিশীল মানুষকে “এলিট” ট্যাগ দিয়ে বাতিল করে দেয়াটা তাদের ডানপন্থী পপুলিস্ট রাজনীতির জন্য অত্যন্ত কার্যকর।
ইন্টেলেকচুয়ালদের বাতিল করে দিলেও পিনাকী কিন্তু নিজের ইন্টেলেকচুয়াল ক্রেডেনশিয়াল দিতে ভুলে যাননা। যে ভিডিওটা নিয়ে আলোচনা করছি, সেই ভিডিওর ২.৫৫ মিনিটের মাথায় পিনাকী দর্শকদের স্মরণ করিয়ে দেন যে তিনি সেলস এবং মার্কেটিং-এর অভিজ্ঞ মানুষ। তিনি মার্কেটিং কমিউনিকেশন খুব ভালো বোঝেন।
স্ট্র্যাটেজি তিন: KISS – Keep it Simple and Dumb
মজার ব্যাপার হলো পিনাকী নিজেই বলেছেন, মানুষ পড়ে না, বিশ্লেষণ করে না। মানুষ এখন শুধু স্ক্যান করে, শর্টকাট নেয়। জটিল ভাষা কেউ শোনে না। যে জনগোষ্ঠীর ক্রিটিক্যাল থিংকিং-এর কোন ট্রেনিং নাই, যাদের ভালো বই বা লম্বা অ্যানালাইসিস পড়ে বোঝার সময় বা ক্ষমতা কোনটাই নাই, তাদেরকে কীভাবে আকর্ষণ করতে হবে সেটা পিনাকী খুব ভালো বোঝেন। এই কারণেই পিনাকী বেছে নিয়েছেন সোশ্যাল মিডিয়া। তার তৈরি ভিডিওগুলো চটকদার। এগুলো বই বা অনলাইনের লম্বা অ্যানালাইসিসের টেক্সটের মত বোরিং না। এগুলো মানুষের মনোযোগ ধরে রাখতে পারে। পিনাকী যা বলছেন, সেই টকিং পয়েন্টগুলো একটু পরপর ব্যাকগ্রাউন্ডে অ্যানিমেটেড হয়ে লিখিতভাবে আসছে। তিনি অপ্রমিত বাংলা আর সেক্সিস্ট স্ল্যাং-এর সাথে প্রচুর ছবি, ভিডিও আর অ্যানিমেশন ব্যবহার করেন। একই সাথে ব্যবহার করেন প্রচুর “রেফারেন্স” – পত্রিকার স্ক্রিনশট থেকে থেকে শুরু করে নানাধরণের রেফারেন্স। এই রেফারেন্সগুলো দর্শকদেরকে পিনাকীর ইন্টেলেকচুয়াল অ্যাবিলিটির ব্যাপারে আশ্বস্ত করে। দর্শকদের যেহেতু রেফারেন্স ঘেঁটে দরকারি তথ্যটুকু বের করার হয় সময় নাই না হয় ক্ষমতা নাই, তাই পিনাকীই তাদের হয়ে গবেষণা করে “সিম্পল অ্যান্ড ডাম্ব” মেসেজটা বের করে নিয়ে আসেন। কিন্তু একটু গভীরে গিয়ে চিন্তা করলেই দেখা যায় পিনাকীর কনটেন্ট মোটেই সিম্পল অ্যান্ড ডাম্ব না। এর পেছনে অত্যন্ত সাবধানী প্ল্যানিং আছে, অভিজ্ঞ ও জ্ঞানী মানুষদের ইনপুট আছে, একটা পুরোদস্তুর টিম আছে এবং বড় অ্যামাউন্টের ফান্ড আছে। কোনধরণের বিজ্ঞাপন ছাড়াই এই কোয়ালিটির কনটেন্ট একটা মানুষ এই হারে একা দিনের পর দিন তৈরি করে যাচ্ছে, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
স্ট্র্যাটেজি চার: একজন “আদার” বা “অপর” প্রতিপক্ষ তৈরি করা
ডানপন্থী পপুলিজমের সফলতার আরেকটা উপাদান হলো একটা “আদার” বা “অপর” প্রতিপক্ষ দাঁড় করানো। ঘুরে-ফিরে আপনি সব দোষ এই আদারের ওপরে দেবেন। আমেরিকায় যেমন এখন ঘুরে-ফিরে সব দোষ হলো ইমিগ্র্যান্ট আর মুসলিমদের, তেমন পিনাকীরও একটা খুব কার্যকর “আদার” আছে। এই মুহূর্তে সেই “আদার” হলো ভারত। যে ভিডিওটা আলোচনা করছি, সেখানে ৬.০২ মিনিটের মাথায় পিনাকী বাংলাদেশের মূল চারটি সমস্যা চিহ্নিত করেন: দারিদ্র্য, দুর্নীতি, বেকারত্ব আর ভারতের আধিপত্য। দারিদ্র, দুর্নীতি, বেকারত্ব বুঝলাম। কিন্তু চীনের আধিপত্য নিয়ে কথা বলবো না, আমেরিকার আধিপত্য নিয়ে কথা বলবো না। শুধু ভারতীয় আধিপত্য নিয়ে আমাদের মাথা-ব্যথা কেন? ইন ফ্যাক্ট, চীন আর আমেরিকার সাথে কীভাবে একইসাথে “ভালো সম্পর্ক” রাখা যায় তার ওপরে পিনাকীর আলাদা এপিসোডই আছে। ট্রাম্পের মত একজন যুদ্ধবাজ, স্বৈরাচারী সরকার প্রধানের সাথে কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সুসম্পর্ক বজায় রাখার উপায় নিয়ে পিনাকী দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, পিনাকীর আমেরিকার বৈশ্বিক আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে সমস্যা নাই। চীনের নয়া সাম্রাজ্যবাদী বিস্তার নিয়ে কোন মাথা ব্যথা নাই। ইন ফ্যাক্ট হাসিনার আমলে বাংলাদেশ সরকার ১৪টা অবকাঠামগত প্রজেক্টের জন্য চীন থেকে ১০ বিলিয়ন আমেরিকান ডলারের ঋণ নিয়েছিল। সেই ঋণের শর্তগুলো বেশ শক্ত ছিল। চীনের ওপরে আমাদের অর্থনৈতিক নির্ভরতা নিয়ে পিনাকী কিন্তু চিন্তিত নন। যত সমস্যা শুধু ভারতীয় আধিপত্যের! ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং! পপুলিস্ট রাজনীতির একটা আদার লাগে। পিনাকীর আদার হলো ভারত। ভারতের আধিপত্য নিয়ে তিনি যেসব কথা-বার্তা বলেন তার বড় অংশই সত্য। কিন্তু পিনাকীর কথা-বার্তায় মনে হবে তিনি সবধরণের সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যের বিরোধী। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের মত সুপারপাওয়ারের আধিপত্যের ব্যাপারে তিনি কিন্তু নিশ্চুপ।
স্ট্র্যাটেজি পাঁচ: সামাজিক ন্যায়-বিচারের ভাষাকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার
পিনাকী সামাজিক ন্যায়-বিচারের ভাষাকে নিজের স্বার্থে ব্যবহারে ভীষণভাবে পারদর্শী। আলোচ্য ভিডিওতে পিনাকী আলোচনা করেছে, কীভাবে “বিগ ক্যাপিটাল” অর্থাৎ বড় কর্পোরেট শক্তি সরকারের রেগুলেটরি মেকানিজমকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে, কীভাবে বিগ ক্যাপিটাল অটোমেশনের মাধ্যমে বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন করে স্মল ক্যাপিটাল অর্থাৎ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাকে প্রতিযোগিতায় টিকতে দেয় না এবং কীভাবে বিগ ক্যাপিটাল চাকরির ক্ষেত্র তৈরি করার বদলে চাকরি বিলুপ্ত করে। পিনাকী ফলোয়ারদেরকে অলিগার্কি ভেঙে দেয়ার আহবান জানান।
কিন্তু জামায়াতে ইসলামী কত বড় অলিগার্ক এটা নিয়ে কিন্তু পিনাকী নীরব। জামায়াত এবং ইসলামী ছাত্র শিবিরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মীর কাশেম সৌদি সরকারসহ বিভিন্ন উৎস থেকে জামায়াতের জন্য বিশাল পরিমাণ ফান্ড রেইজ করেছেন। মীর কাশেম ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ভাইস চেয়ারম্যান। স্বাস্থ্য, পরিবহন, ব্যাংক, টেলিকমিউনিকেশন্স, মিডিয়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ তার অসংখ্য ব্যবসা। ইবনে সিনা ট্রাস্ট, দিগন্ত মিডিয়া, কেয়ারি লিমিটেড সহ অনেক প্রতিষ্ঠানের মালিক তিনি। জামায়াতের অন্য নেতারা অসংখ্য মাদ্রাসা থেকে শুরু করে ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চিটাগং এবং মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন। আওয়ামী লীগের শাসনামনে জামায়াত যে অর্থনৈতিক প্রতিপত্তি হারিয়েছে, সেটা পুনরুদ্ধার করার জন্য এখন জামায়াত পুরোদমে কাজ করে যাচ্ছে।
এখানেই পিনাকীর ফাঁপা বামপন্থী সামাজিক ন্যায়-বিচারের ভাষার অপপ্রয়োগ ধরা পড়ে। তিনি বিগ ক্যাপিটাল আর অলিগার্কি ভেঙে দেয়ার কথা বলেন। কিন্তু জামায়াতের বিগ ক্যাপিটাল আর অলিগার্কির প্রতিপত্তি আর এনসিপির অলিগার্কির সাথে মাখামাখি নিয়ে কিন্তু কবি নীরব।
স্ট্রাটেজি ছয়: গল্পকথন
পিনাকী অসম্ভব ভালো একজন গল্পকথক – স্টোরিটেলার। কাহিনী দিয়ে, তথ্য আর পরিসংখ্যান দিয়ে, ভিডিও দিয়ে আর “স্কলারলি” সোর্স দিয়ে যুক্তির অকাট্যতার ব্যাপারে তিনি অডিয়েন্সকে কনভিন্স করে ফেলতে পা্রেন। পিনাকী সেক্সিস্ট গালি আর স্ল্যাং দিয়ে ফলোয়ারদের হাসান, অপ্রমিত আর চাঁছা-ছোলা বাংলা দিয়ে নন-এলিট মানুষের কাছাকাছি চলে যান। এই নন-এলিট মানুষ কিন্তু প্রতিদিনের জীবনযাত্রার ঘানি ঠেলেই ক্লান্ত। তাদের সময় বা এনার্জি বা ট্রেনিং — কোনটাই নেই পিনাকীর দেয়া “অকাট্য” এভিডেন্সগুলো ঘেঁটে সেগুলোর সত্যতা যাচাই-বাছাই করা। পিনাকী যা বলছে, সেটা তারা শোনে। কিন্তু পিনাকী যা বলে না, সেটা নিয়ে চিন্তা করার স্কোপ পিনাকীর অডিয়েন্সের নেই। ফলে ভারতের আধিপত্য নিয়ে পিনাকী জনরোষ তৈরী করতে পারেন। কিন্তু এই জনতাই চীনের আধিপত্য বা যুক্তরাষ্ট্রের সামাজ্র্যবাদ নিয়ে মাথা ঘামায় না। বরং তারা বিশ্বাস করতে শেখে যে ভারতের আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে চীন তাদের বন্ধু। পিনাকীর ফলোয়াররা বিগ এলিট অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্যাপিটাল হিসেবে প্রথম আলো, ডেইলি স্টার আর ছায়ানট্কে ঘৃণা করতে শেখে। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী যে কত বড় অলিগার্ক, জামায়াতে ইসলামী নেতারা যে কী পরিমাণ বিগ ক্যাপিটালের মালিক – সেটা নিয়ে কারো কোনো মাথা ব্যথা নেই।
পিনাকী নিজেই আলোচ্য ভিডিওতে রাষ্ট্রের ন্যারেটিভ রিসোর্সের কথা বলেছে। তিনি বলেছেন এই ন্যারেটিভ হচ্ছে রাষ্ট্রের একটা বড় সম্পদ যেটা রাষ্ট্র সরকারি মিডিয়া, বিজ্ঞাপন ইত্যাদি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে। কথা সত্যি। কিন্তু যে কথাটা তিনি বলেননি, সেটা হলো তিনি নিজেও একটা ডানপন্থী পপুলিস্ট ন্যারেটিভ তৈরি করার মত একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছেন। এই ডানপন্থী পপুলিস্ট ন্যারেটিভ দিয়ে বিদেশে বসেই তিনি অনেক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পিনাকীর পপুলিস্ট ন্যারেটিভ সামাজিক ন্যায়-বিচারের ভাষাকে কুক্ষিগত করে মানুষকে এলিট গোষ্ঠীর তৈরি করা “সিস্টেম” ভাঙার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। কিন্তু পিনাকীর পপুলিজম যে নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠী, দল, এবং বিগ ক্যাপিটালের স্বার্থ রক্ষা করে, সেটা পিনাকী খুব চাতুর্যের সাথে তার ফলোয়ারদের থেকে লুকিয়ে রাখেন।
বাংলাদেশে বামপন্থী, প্রগতিশীল পপুলিস্ট পলিটিশিয়ান, অ্যাকাডেমিশিয়ান, অ্যাক্টিভিস্ট যারা আছেন, তাদের অনেকে দীর্ঘদিন ধরে মাঠে নেমে আন্দোলন করছেন, লেখালেখি করছেন। কিন্তু সত্য কথা হচ্ছে আম-জনতা একেবারে ভয়ংকর কিছু না হলে অথবা নিজের স্বার্থের সাথে সংশ্লিষ্ট না হলে মাঠের আন্দোলন ফলো করে না। লম্বা লেখা পড়ে চিন্তা করার ধৈর্যও মানুষের নাই। বাংলাদেশের জন-সাধারণের মাঝে সোশ্যাল মিডিয়ার রিচ এখন ভয়াবহ। সোশ্যাল মিডিয়া এখন মেইনস্ট্রিম মিডিয়া এবং বই-পত্র-পত্রিকা থেকে শুরু করে সবধরণের এডুকেশনাল সোর্সকে ওভাররাইড করে ফেলেছে। সোশ্যাল মিডিয়াতে অল্টারনেটিভ এবং সত্যিকার অর্থে সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদবিরোধী, বিউপনিবেশবাদী এবং নারীবাদী প্রগতিশীল ন্যারেটিভ তৈরি করে সার্কুলেট করতে না পারলে পিনাকী এবং তার মত সো-কল্ড পপুলিস্ট “অ্যাক্টিভিস্ট”-দের রিচ বাড়তেই থাকবে। আম-জনতা তাদেরকেই নলেজ প্রডাকশনের দায়িত্ব দিয়ে তাদেরকেই গুরু মেনে বসে থাকবে – এবং এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে এই ডানপন্থী পপুলিস্টরা তাদের উগ্র জাতীয়তাবাদী ঘৃণার রাজনীতি চালিয়ে যাবে আর নিজেদের আখের গোছাবে। মাঝখান থেকে বাংলাদেশের খেটে-খাওয়া মানুষ, বাংলাদেশের নারী, বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বাংলাদেশের আদিবাসী, বাংলাদেশের লৈঙ্গিক বৈচিত্র্যের মানুষ এবং প্রান্তিক অবস্থানে থাকা সকল মানুষ — যাদের অবস্থান বিগ ক্যাপিটাল থেকে অনেক অনেক দূরে — তাদের দুঃখ-কষ্ট আর ভোগান্তি দিনের পর দিন কোন আশার আলো দেখবে না।
নাফিসা নিপুণ তানজীম একজন শিক্ষক, গবেষক, লেখক ও সংগঠক। তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের উস্টার স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অফ ইন্টারডিসিপ্লিনারি স্টাডিজে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন।
