প্রেস বিবৃতি (বাংলা)
১০ এপ্রিল ২০২৬, শুক্রবার, সন্ধ্যা আনুমানিক ৭:৩০। ছুটির দিন, সামনে নববর্ষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নববর্ষের প্রস্তুতি চলছে। আমরা ৮ থেকে ১০ জন বন্ধু শাহবাগ থানার উল্টা পাশে একটি চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলাম এবং আড্ডা দিচ্ছিলাম। আমাদের পরিকল্পনা ছিল চারুকলা এবং আশপাশ ঘুরে দেখা। আমাদের মধ্যে একজন হিজড়া বন্ধু এবং একজন ট্রান্সম্যান বন্ধুও ছিলেন। আমরা তখনও বুঝে উঠি নি এই সাধারণ, নিরীহ বন্ধু আড্ডা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ভয়াবহ সহিংসতায় পরিণত হবে।
জাতীয় জাদুঘর এবং পুরাতন পাবলিক লাইব্রেরির মাঝামাঝি জায়গায় “আজাদী আন্দোলন”-এর ব্যানারে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জনের একটি দল জটলা পাকাতে থাকে। তারা প্রকাশ্যে তৃতীয় লিঙ্গ, সমকামী, বাইসেক্সুয়াল এবং ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের ওপর হামলার হুমকি দিতে থাকে। তারা বলতে থাকে যে ট্রান্সজেন্ডার ও সমকামীদের জবাই করা উচিত, মেরে ফেলা উচিত। এবং দশ মিনিটের মধ্যে স্থান ত্যাগ না করলে তাদের হাত পা ভেঙে ফেলার হুমকি দেয়। আমরা তাদের সমাবেশ থেকে এইসব উস্কানিমূলক বক্তব্য শুনতে পাই।
এরপর তারা মিছিল করতে করতে আমাদের চায়ের দোকানের দিকে এগিয়ে আসে।
আমরা তখনও বুঝে উঠতে পারিনি কী হতে যাচ্ছে।
আমাদের মধ্যে একজন সমাবেশের কাছে ছিলেন। মিছিল দেখে তিনি ভিডিও করা শুরু করেন। মিছিল এগিয়ে আসার সাথে সাথে চায়ের দোকানেও কয়েকজন ভিডিও করা শুরু করে।
আমরা চা শেষ করে সেখান থেকে উঠে চারুকলায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সেখানে অন্য বন্ধুরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল।
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তারা আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। মিছিলটা প্রথমে আমাদের পার করে যাওয়ার পর আমাদের সাথে থাকা হিজড়া বন্ধুকে দেখে আবার ঘুরে আমাদের দিকে এগিয়ে আসে। আমরা তখনো বুঝে উঠতে পারি নি কী হতে যাচ্ছে। তাদের সাথে কিছু মোবাইল সাংবাদিকও এগিয়ে আসে। এরপর আমাদের সেই বন্ধুর মুখে আলো ফেলে বলা শুরু করা হয় যে “সমকামীরা যেন জায়গা ছেড়ে যায়”।
আমরা শান্তভাবে কথা বলার চেষ্টা করি। বিষয়টিকে ভুল বোঝাবুঝি হিসেবে বলার চেষ্টা করি। কিন্তু তারা কোনো কথা শুনতে চায়নি। মুহূর্তের মধ্যে আমাদের “সমকামী” আখ্যা দিয়ে আমাদের উপর চড়াও হয় এবং আক্রমণ শুরু করে।
আমাদের মধ্যে এক নারী বন্ধুর বুকে হাত দেওয়া হলে আমরা এর প্রতিবাদ করি। উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে আমাদের মারধর শুরু করে। শুরুতে আমরা পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করলেও এত বড় দলের সামনে আমরা দ্রুত কোণঠাসা হয়ে পড়ি। আমরা একটি চায়ের দোকানে শান্তিপূর্ণভাবে বসে ছিলাম, তারাই আমাদের দিকে এগিয়ে এসে হামলা চালায়, যার ভিডিও প্রমাণাদি আছে। চা-ওয়ালা এবং কিছু পথচারী সাহায্যের চেষ্টা করলেও কিছু মোবাইল সাংবাদিক এই হামলাকারী দলকে সহায়তা এবং উস্কানি দিচ্ছিল।
এই সময় শাহবাগ থানার সামনে পুলিশ উপস্থিত ছিল। ঘটনাটি তাদের সামনে ঘটলেও একজন পুলিশ সদস্যের কাছে গিয়ে সাহায্য চাইলে তিনি নির্লিপ্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন।
এদিকে নির্মম শারীরিক আক্রমণ চলতেই থাকে। মেয়েদের চুল টেনে মাটিতে ফেলে লাথি মারা হয়। ইট বোঝাই ব্যাগ দিয়ে আঘাত করা হয়। নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে আক্রমণ এবং শ্লীলতাহানী করা হয়, যা ভিডিওতে দৃশ্যমান। বিশেষ করে মাথা, বুক, পিঠ এবং যৌনাঙ্গ লক্ষ্য করে আঘাত করা হয়। মেয়েদের জামাকাপড় খুলে ফেলার চেষ্টা করা হয় এবং কয়েকজনের কাপড় ছিঁড়ে ফেলা হয়। আমাদের ছেলেরা মেয়েদের রক্ষা করার চেষ্টা করলে হামলাকারীরা মেয়েদের আলাদা করে টেনে নিয়ে গিয়ে শারিরীক আঘাত করে। আমরা তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু তারা উল্টো আরও সহিংস হয়ে ওঠে। তাদের বাঁচাতে গিয়ে ছেলেরাও মারধরের শিকার হয়।
দলবদ্ধভাবে আমাদের আলাদা করে ফেলে একেকজনকে ঘিরে আক্রমণ করা হয়। মাটিতে ফেলে মাথা, বুক এবং পিঠে লাথি মারা হয়। আমাদের মধ্যে দুজনের চশমা ভেঙে যায়, দুইজনের কাপড় ছিঁড়ে ফেলা হয়, কয়েকজনের জুতা ছিঁড়ে যায়। সবাই শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতপ্রাপ্ত হয়।
স্থানীয় দোকানদার এবং পথচারীদের সহায়তায় আমরা কোনোভাবে সেখান থেকে বের হতে পারি। এবং থানার দিকে যাওয়ার পথে মোবাইল সাংবাদিকরা বারবার উস্কানি দিতে থাকে এবং আমাদের সাথে থাকা নারীদের অবান্তর প্রশ্ন করে বিব্রত করে। তাদের আচরণে মনে হয়েছে তারাও হামলাকারীদের থেকে কম যান না।
থানায় ঢোকার পরও তারা আমাদের সামনে এসে প্রশ্ন এবং রেকর্ড করতে থাকে। বারবার রেকর্ড না করতে অনুরোধ করা সত্ত্বেও আমাদের সাথে থানার ভেতরে ঢুকে পড়ে। গেইটে থানা কর্তৃপক্ষ তাদের কোন বাধা দেয় নি। আমরা থানার ভিতরে একটি কক্ষে প্রবেশ করলে তারা বাইরে থেকেও ভিডিও করতে থাকে এবং ঢোকার চেষ্টা করে। থানার লোকজন প্রথমে নীরব ছিল, পরে আমাদের চাপে তাদের বের করে দেওয়া হয়।
আমরা মামলা করার কথা বললে পুলিশ জানায় মামলা নেওয়া যাবে না। তারা সম্পূর্ণ অসহযোগিতা করে। জিডি নিতেও অস্বীকৃতি জানায়। আহত অবস্থায় আমাদের কোনো সাহায্য করা হয়নি, এমনকি তাদের বারবার বলার পরেও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়নি। থানায় আমাদের ভিডিও করতে বাধা দেওয়া হলেও মোবাইল সাংবাদিকদের কিছু বলা হয়নি।
এরপর আমরা পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী এবং পরিচিতদের ফোন করে যোগাযোগ করতে থাকি। আমাদের অ্যাক্টিভিস্ট, আইনজীবী, প্রকৃত সাংবাদিক বন্ধু এবং সহকর্মীরা এগিয়ে আসেন। প্রায় তিন ঘণ্টা অনুরোধ এবং চাপ প্রয়োগের পর পুলিশ এফআইআর নেওয়ার আশ্বাস দেয়। আমরা এফআইআর করি, যা ফাইল করতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে।
কিন্তু পরে আইনজীবীর মাধ্যমে জানতে পারি, যেটিকে এফআইআর বলা হয়েছিল, সেটি প্রকৃতপক্ষে এফআইআর নয়। জিডিও নয়। এটি শুধুমাত্র একটি অভিযোগপত্র হিসেবে দাখিল করা হয়েছে।
এরপর আমরা ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে চিকিৎসা নিই এবং মেডিকেল রিপোর্ট সংগ্রহ করি। রাত প্রায় সাড়ে তিনটার দিকে আমরা যার যার বাসায় ফিরি।
আমরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এবং শারীরিকভাবে সুস্থ হওয়ার চেষ্টা করছি।
এই হামলা শুধু আমাদের উপর নয়। এটি আমাদের মৌলিক অধিকার, নিরাপত্তা এবং মানবিক মর্যাদার উপর সরাসরি আঘাত, এটি আমাদের সাংবিধানিক নাগরিক অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করে।
আমরা এই ঘটনার পূর্ণ তদন্ত, দায়ীদের চিহ্নিতকরণ এবং বিচার দাবি করছি।
আমরা নিরাপত্তা চাই। আমরা ন্যায়বিচার চাই।
কাজী মোয়াজ্জমা তাসনিম, সমাজকর্মী
ওর্চি লোহানী, শিল্পী
কাজী তাহসিন আগাজ, শিল্পী-কিউরেটর
আমিনা সুলতানা, মানবাধিকার কর্মী
নির্ণয় এইচ ইসলাম, শিক্ষক, ট্রান্স অধিকার কর্মী
হাসিবুর রহমান, অধিকার কর্মী
