শিশু যৌন নিপীড়ন, পরিচয়ের অপরাধীকরণ ও রাজনৈতিক দৃশ্যায়নের বিন্যাস : ৬০০ আলেমের ৩৭৭ ধারা কার্যকরের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে একটি প্রতিক্রিয়া

Posted by

·

,

লিখেছেন ফয়সাল জামান

সাভারের একটি মাদ্রাসায় সাত বছর বয়সী এক শিশুর ওপর যৌন নিপীড়নের অভিযোগ নিঃসন্দেহে গুরুতর এবং গভীরভাবে উদ্বেগজনক। শিশুর ওপর যৌন সহিংসতা এমন একটি অপরাধ, যার বিচার প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন শিশুর বয়স, সম্মতিদানের অক্ষমতা, ক্ষমতার অসম বিন্যাস এবং নির্যাতনের কাঠামোকে কেন্দ্র করে। অভিযুক্ত শিক্ষক বা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তাদের শনাক্ত করা, নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করা, প্রমাণ সংগ্রহ করা এবং আইনের আওতায় জবাবদিহি নিশ্চিত করাই ন্যায়বিচারের মৌলিক শর্ত। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ঘটনায় চার শিক্ষক ও ছয় শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং শিশুটির পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার নির্যাতনের অভিযোগ তোলা হয়েছে।

কিন্তু ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ৬০০ আলেমের বিবৃতিতে এই নির্দিষ্ট অপরাধের প্রশ্ন দ্রুত একটি বৃহত্তর নৈতিক ও রাজনৈতিক আখ্যানের মধ্যে স্থানান্তরিত হয়েছে। শিশুর ওপর যৌন নিপীড়নের অভিযোগ থেকে বক্তব্যটি সমকামিতা, LGBTQIA+ জনগোষ্ঠী, এনজিও, বিদেশি অর্থায়ন, অ্যাপভিত্তিক নেটওয়ার্ক এবং দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারার প্রয়োগের প্রশ্নে বিস্তৃত হয়েছে। ফলে অপরাধের কেন্দ্রবিন্দু ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট অপরাধীর কর্মকাণ্ড থেকে একটি সামাজিক পরিচয়ের দিকে সরে যায়। প্রকাশিত বিবৃতিতে ৩৭৭ ধারার কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি সমকামিতার প্রচার ও প্রসারের সঙ্গে যুক্ত এনজিওগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করা হয়েছে।

এই স্থানান্তরই বক্তব্যটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য।

সমকামিতা এবং শিশু যৌন নিপীড়ন এক  বিষয়  না

সমকামিতা একটি যৌন অভিমুখিতা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌনস্বাস্থ্য-সংক্রান্ত কাঠামো যৌন অভিমুখিতাকে যৌনতার একটি মাত্রা হিসেবে বিবেচনা করে এবং যৌন অভিমুখিতাকে নিজে কোনো বিকার হিসেবে চিহ্নিত করে না। 

অন্যদিকে শিশুর ওপর যৌন নিপীড়ন হলো এমন যৌন কার্যক্রমে শিশুকে জড়িত করা, যা সে সম্পূর্ণভাবে বুঝতে পারে না, যার জন্য সে অবহিত সম্মতি দিতে সক্ষম না, অথবা যার জন্য সে বিকাশগতভাবে প্রস্তুত না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞায় শিশুর ওপর যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রে ক্ষমতা, দায়িত্ব, আস্থা এবং নির্ভরতার সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ।

অতএব এখানে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারণাগত ক্ষেত্রকে পৃথক রাখা জরুরি। একদিকে রয়েছে যৌন অভিমুখিতা, অন্যদিকে রয়েছে শিশুর ওপর যৌন সহিংসতা। একটি অপরাধীর যৌন অভিমুখিতা তার দ্বারা সংঘটিত অপরাধের কারণ হিসেবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। একইভাবে কোনো অপরাধের শিকার ব্যক্তি LGBTQIA+ হলে তার পরিচয় তাকে অপরাধী করে না।

এই মৌলিক পার্থক্য মুছে দিয়ে সমকামিতা ও শিশু যৌন নিপীড়নকে একই নৈতিক ও অপরাধমূলক শ্রেণিতে স্থাপন করা একটি গুরুতর ধারণাগত বিভ্রান্তি। এখানে অপরাধের প্রকৃতি এবং পরিচয়ের প্রকৃতিকে পরস্পরের মধ্যে প্রতিস্থাপন করা হয়।

৩৭৭ ধারা এবং ঔপনিবেশিক  আইনের  উত্তরাধিকার

বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা বর্তমানে বহাল রয়েছে। ধারাটিতে “against the order of nature” ধরনের ঔপনিবেশিক আইনভাষা ব্যবহার করে নির্দিষ্ট যৌন আচরণকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন অথবা সর্বোচ্চ দশ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

ফলে ৩৭৭ ধারাকে শিশুর নিরাপত্তার সমার্থক হিসেবে উপস্থাপন করা ধারণাগতভাবে সমস্যাজনক। শিশুর ওপর যৌন নিপীড়ন অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধের আওতায় পড়বে। কিন্তু সম্মতিপূর্ণ প্রাপ্তবয়স্কদের সমলিঙ্গীয় যৌন আচরণ এবং একটি শিশুর ওপর জবরদস্তিমূলক যৌন সহিংসতা একই আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন না।

এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো অপরাধের বস্তুগত নির্দিষ্টতা। শিশুর ওপর যৌন সহিংসতার কেন্দ্রে রয়েছে শিশুর নিরাপত্তা, সম্মতির অক্ষমতা, ক্ষমতার অসমতা এবং শোষণ। বিপরীতে ৩৭৭ ধারার ভাষা যৌন আচরণের একটি নির্দিষ্ট শ্রেণিকে “প্রকৃতির বিধিবিরুদ্ধ” হিসেবে নির্মাণ করে। ফলে শিশুর সুরক্ষার প্রশ্ন এবং প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের যৌন আচরণ নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নকে একই আইনি কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করলে দুটি ভিন্ন সমস্যার ধারণাগত সীমানা বিলীন হয়ে যায়।

অপরাধী কোথায়, আর সমকামিতা কোথায়

একটি শিশুর ওপর যৌন নিপীড়নের অভিযোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হওয়া উচিত কে অপরাধ করেছে, কী ঘটেছে, কী প্রমাণ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে ব্যর্থ হয়েছে, অভিযোগ কীভাবে মোকাবিলা করা হয়েছে এবং শিশুটির নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন কীভাবে নিশ্চিত করা হবে।

কিন্তু যখন এই প্রশ্নের পাশে সমকামিতাকে একটি সামাজিক ব্যাধি, নৈতিক অবক্ষয় অথবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করা কোনো বহিরাগত শক্তি হিসেবে হাজির করা হয়, তখন অপরাধের কাঠামোই বদলে যায়।

অপরাধীর নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ড অনুসন্ধানের জায়গায় একটি সমগ্র জনগোষ্ঠীর ওপর সন্দেহ আরোপিত হয়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক স্থানচ্যুতি ঘটে। শিশুর ওপর সংঘটিত নির্যাতনের নির্দিষ্টতা হারিয়ে গিয়ে LGBTQIA+ মানুষের অস্তিত্বই আলোচনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

এই কারণেই এমন বক্তব্যকে কেবল শিশু সুরক্ষার বক্তব্য হিসেবে পড়লে এর রাজনৈতিক মাত্রাটি অদৃশ্য হয়ে যায়।

একটি  ভয়াবহ  অপরাধ  কীভাবে  দৃশ্যায়িত  রাজনৈতিক প্রদর্শনীতে পরিণত হয়

এখানে রাজনৈতিক প্রদর্শনী বলতে কেবল কোনো ঘটনা প্রচারিত বা দৃশ্যমান হওয়াকে বোঝানো হচ্ছে না। বরং এমন একটি দৃশ্যমানতার বিন্যাসকে বোঝানো হচ্ছে, যার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট ঘটনা বিশেষ রাজনৈতিক অর্থ, আবেগ এবং সামাজিক প্রতিক্রিয়া উৎপাদনের উপযোগী করে পুনর্গঠিত হয়।

শিশুর ওপর যৌন নিপীড়নের মতো গভীরভাবে আবেগঘন একটি ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্ক, ক্ষোভ এবং ন্যায়বিচারের দাবি তৈরি করে। এই আবেগের রাজনৈতিক শক্তি তখন এমন একটি বয়ানের দিকে পরিচালিত করা যেতে পারে, যেখানে অপরাধের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠীর অস্তিত্বকে যুক্ত করা হয়।

এই বিবৃতিতে সেই প্রক্রিয়াটি প্রায় একটি কারণ-সম্পর্কের শৃঙ্খল তৈরি করে:

শিশু যৌন নিপীড়ন → সমকামিতা → নৈতিক অবক্ষয় → LGBTQIA+ নেটওয়ার্ক → এনজিও → বিদেশি অর্থায়ন → ৩৭৭ ধারা।

কিন্তু এই শৃঙ্খলের প্রতিটি সম্পর্ক প্রমাণিত কারণগত সম্পর্ক না।

ফলে একটি নির্দিষ্ট অপরাধ একটি রাজনৈতিক সংকেতচিহ্নে পরিণত হয়। শিশুর ওপর সংঘটিত সহিংসতা তখন বৃহত্তর সামাজিক আতঙ্ক উৎপাদনের উপাদানে পরিণত হয় এবং সেই আতঙ্কের লক্ষ্য হয়ে ওঠে একটি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী।

সমকামী সহিংসতা শব্দবন্ধের রাজনৈতিক তাৎপর্য

‘সমকামী সহিংসতা’ শব্দবন্ধটিও এই কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৫ সেপ্টেম্বরের বিবৃতির সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে এই শব্দবন্ধটি সরাসরি ব্যবহৃত হয়েছে।

শিশুর ওপর সংঘটিত যৌন নিপীড়নকে যদি ‘সমকামী সহিংসতা’ হিসেবে নাম দেওয়া হয়, তাহলে সহিংসতার উৎস হিসেবে একটি যৌন অভিমুখিতাকে চিহ্নিত করা হয়। এতে অপরাধীর নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে সমকামিতাই সন্দেহের বিষয় হয়ে ওঠে।

এটি ভুক্তভোগী এবং অপরাধী উভয় সম্পর্কেই বিভ্রান্তি তৈরি করে।

কারণ সমকামিতা কোনো ব্যক্তিকে শিশু যৌন নির্যাতনকারী হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে না। একইভাবে শিশুর ওপর যৌন নির্যাতনের একটি ঘটনা থেকে বৃহত্তর LGBTQIA+ জনগোষ্ঠীর নৈতিক চরিত্র সম্পর্কে কোনো সাধারণ সিদ্ধান্ত তৈরি করা যায় না।

একটি অপরাধকে যথাযথ নামে ডাকা তাই রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। ‘শিশু যৌন নিপীড়ন’ শব্দবন্ধ অপরাধের কেন্দ্রকে শিশুর নিরাপত্তা এবং অপরাধীর জবাবদিহির দিকে রাখে। ‘সমকামী সহিংসতা’ শব্দবন্ধ সেই কেন্দ্রকে একটি পরিচয়ের দিকে স্থানান্তর করে।

নামকরণ এখানে নিছক ভাষাগত বিষয় না। নামকরণ নির্ধারণ করে কোনো ঘটনাকে কোন জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে দেখা হবে, কার ওপর সন্দেহ কেন্দ্রীভূত হবে এবং কোন ধরনের সামাজিক প্রতিক্রিয়া বৈধ বলে বিবেচিত হবে।

নৈতিক আতঙ্ক এবং রাজনৈতিক সমাবেশ

এই ধরনের বক্তব্যে নৈতিক আতঙ্কের একটি কাঠামোও শনাক্ত করা যায়। একটি বাস্তব ও ভয়াবহ সামাজিক সমস্যা থেকে বৃহত্তর কোনো জনগোষ্ঠীকে সামাজিক বিপদের উৎস হিসেবে নির্মাণ করা হয়। তখন ব্যক্তিগত অপরাধ একটি সমষ্টিগত হুমকির প্রতীকে পরিণত হয়।

এখানে শিশুর নিরাপত্তা একটি শক্তিশালী নৈতিক ভাষা হিসেবে কাজ করে। শিশুকে রক্ষার দাবি স্বাভাবিকভাবেই জনসমর্থন তৈরি করতে পারে। সেই নৈতিক আবেগের সঙ্গে LGBTQIA+ মানুষের অস্তিত্বকে যুক্ত করা হলে একটি সামাজিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর নিয়ন্ত্রণের দাবি সহজেই বৈধতার ভাষা অর্জন করতে পারে।

এখানেই শিশু সুরক্ষার ভাষা এবং বর্জনমূলক রাজনীতির মধ্যে একটি সংযোগ তৈরি হয়।

তবে এই সংযোগকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিপ্রায় সম্পর্কে অনুমান করার প্রয়োজন নেই। বক্তব্যের ভাষা, বিষয়গুলোর পারস্পরিক সংযোগ এবং প্রস্তাবিত আইনি ব্যবস্থার কাঠামো বিশ্লেষণ করলেই এর রাজনৈতিক বিন্যাস পাঠ করা সম্ভব।

মাদ্রাসা, প্রতিষ্ঠান এবং জবাবদিহি

মাদ্রাসা একটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হতে পারে, কিন্তু শিশুদের নিরাপত্তার প্রশ্নে এটি অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চেয়ে আলাদা আইনি বা নৈতিক বাস্তবতায় অবস্থান করে না।

শিশুর ওপর যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠলে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের তত্ত্বাবধানের ব্যবস্থা কীভাবে পরিচালিত হয়, অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা আছে কি না, অভিযোগ গোপন করা হয়েছে কি না, শিশুকে নিরাপদ রাখা হয়েছে কি না এবং কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছে, এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।

সমাজের কোনো প্রতিষ্ঠানকেই নৈতিক পবিত্রতার ধারণা দিয়ে জবাবদিহি থেকে মুক্ত রাখা যায় না। বরং শিশুদের সঙ্গে ক্ষমতাসম্পন্ন প্রাপ্তবয়স্কদের সম্পর্ক যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা ও নির্ভরতার ওপর প্রতিষ্ঠিত, সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

রাজনৈতিক  কার্যসূচির প্রশ্ন

এখানে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর ব্যক্তিগত অভিপ্রায় সম্পর্কে সরাসরি সিদ্ধান্ত দেওয়া প্রয়োজন নেই। কিন্তু বক্তব্যের রাজনৈতিক কাঠামো বিশ্লেষণ করা যায়।

যখন একটি নির্দিষ্ট শিশুর ওপর যৌন নিপীড়নের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ৩৭৭ ধারার কার্যকর প্রয়োগের দাবি তোলা হয়, সমকামিতাকে সামাজিক অবক্ষয়ের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং একই সঙ্গে LGBTQI+-সংশ্লিষ্ট এনজিওগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা চাওয়া হয়, তখন দাবিটি আর কেবল একটি অপরাধের বিচার দাবি হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রকাশিত বিবৃতির প্রতিবেদনগুলোতেও এই বিস্তৃত দাবিগুলোর উল্লেখ রয়েছে।

এটি একটি বৃহত্তর যৌন-নৈতিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট অপরাধের বিচার থেকে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক পরিচয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দিকে বয়ানটি স্থানান্তরিত হয়। এই রাজনৈতিক স্থানান্তরই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ন্যায়বিচারের প্রকৃত কেন্দ্র কোথায়

শিশুটির জন্য ন্যায়বিচার মানে হলো অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা, শিশুর নিরাপত্তা, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সহায়তা, প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের ব্যবস্থা।

এর জন্য LGBTQIA+ মানুষকে অপরাধী হিসেবে নির্মাণ করার প্রয়োজন নেই।

এর জন্য কোনো যৌন অভিমুখিতাকে সামাজিক ব্যাধি হিসেবে ঘোষণা করারও প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন এমন একটি বিচারব্যবস্থা যেখানে অপরাধীর পরিচয়, ধর্ম, সামাজিক মর্যাদা বা যৌন অভিমুখিতা নির্বিশেষে তার নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের বিচার হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শিশু সুরক্ষা কাঠামোও শিশুর ওপর যৌন সহিংসতাকে বয়স, ক্ষমতা, আস্থা, নির্ভরতা এবং সম্মতিদানের সক্ষমতার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করে।

এখানেই শিশুর ন্যায়বিচার এবং LGBTQI+ মানুষের অস্তিত্বকে অপরাধী হিসেবে নির্মাণ করার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য।

উপসংহার

সাভারের শিশুটির ওপর যৌন নিপীড়নের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া। অপরাধ প্রমাণিত হলে অপরাধীর জবাবদিহি অবশ্যই নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সেই ন্যায়বিচারের দাবিকে সমকামিতার বিরুদ্ধে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও নৈতিক অভিযানে রূপান্তর করা ন্যায়বিচারের পরিধিকে প্রসারিত করে না, বরং তার কেন্দ্রকে স্থানান্তরিত করে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন হলো কার বিরুদ্ধে বিচার দাবি করা হচ্ছে এবং কার অস্তিত্বকে সেই বিচারের দৃশ্যের মধ্যে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।

একটি শিশুর ওপর যৌন নিপীড়নকে কেন্দ্র করে LGBTQIA+ জনগোষ্ঠীকে সামাজিক বিপদ হিসেবে নির্মাণ করা হলে শিশুটি আর ন্যায়বিচারের একমাত্র কেন্দ্র থাকে না। তার ওপর সংঘটিত সহিংসতা একটি বৃহত্তর মতাদর্শিক প্রদর্শনীর উপাদানে পরিণত হয়।

তাই প্রকৃত প্রশ্ন হওয়া উচিত সমকামিতা কীভাবে প্রতিরোধ করা হবে তা না, বরং শিশুর ওপর যৌন সহিংসতা কীভাবে প্রতিরোধ করা হবে, প্রতিষ্ঠান কীভাবে জবাবদিহির আওতায় আসবে এবং প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে।

ন্যায়বিচার অপরাধের নির্দিষ্টতা ধরে রাখে। রাজনৈতিক প্রদর্শনী সেই নির্দিষ্টতাকে একটি বৃহত্তর শত্রু নির্মাণের আখ্যানের মধ্যে বিলীন করে দেয়। এই দুইয়ের পার্থক্য বোঝাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি।

ফয়সাল জামান একজন ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট, শিল্প-গবেষক ও শিক্ষাবিদ

Discover more from Bangladesh Feminist Archives

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading