মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান,
আশা করি আপনি সুস্থ আছেন। আপনাকে এই চিঠি লেখার আগে অনেকবার ভেবেছি, কোথা থেকে শুরু করব। একজন অধিকারকর্মী হিসেবে আমি জানি কীভাবে কোনো একটি ঘটনা নিয়ে কথা বলতে হয়, নীতি, আইন এবং মানবাধিকারের ভাষায় একটি যুক্তি তৈরি করতে হয়। কিন্তু আজ আমি সেসব ভাষা দিয়ে শুরু করতে চাই না। আজ আমি শুধু একজন মেয়ে হয়ে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই-একজন ট্রান্সজেন্ডার মেয়ে, যে এই দেশেরই একজন নাগরিক এবং যে প্রতিদিন খুব সাধারণ কিছু জিনিসের জন্য লড়াই করে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি নিজেকে একজন নারী হিসেবেই চিনি, এবং সেই পরিচয়েই বাঁচতে চেয়েছি। নিজের জীবনের এই সিদ্ধান্তটা আমার নিজের কিন্তু এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বুঝেছি, নিজের মতো করে বাঁচতে চাওয়া আর সমাজের কাছ থেকে সেই জীবনটুকু পাওয়ার অধিকার দুটো এক নয়। প্রতিদিন আমাকে নিজের পরিচয়, নিজের নিরাপত্তা এবং নিজের অস্তিত্বের জন্য নতুন করে লড়তে হয়। কারণ এই দেশে আমার কাছে বেঁচে থাকা অনেক সময় কোনো স্বাভাবিক নাগরিক অধিকার নয়, এটা যেন প্রতিদিন আমার জীবনের সাথে এক ধরনের দরকষাকষি। আমি রাস্তায় বের হলে ভাবি, আজ আমাকে কয়বার হেনস্তা হতে হবে? কাজ খুঁজতে গেলে ভাবি, আমার জীবনবৃত্তান্ত দেখার আগেই আমার লিঙ্গপরিচয় কি আমার বিরুদ্ধে যাবে? পুলিশের কাছে যেতে হলে ভাবি, সেখানে আমি একজন ভুক্তভোগী হিসেবে যাব, নাকি আবারও আমাকে আমার পরিচয় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হবে? কোনো বাসা ভাড়া চাইতে গেলে ভাবি, বাড়িওয়ালা আমাকে মানুষ হিসেবে দেখবে, নাকি আমার শরীর ও পরিচয়কে বিচার করবে? কোনো রেস্টুরেন্টে বসলে ভাবি, পাশের টেবিলের মানুষ আমার দিকে তাকিয়ে হাসবে কি না। আর রাতে একা ঘরে ফিরতে হলে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা হয়-আমি নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারব তো? এই প্রশ্নগুলো আপনার কাছে হয়তো খুব ছোট মনে হবে। আপনার কাছে হয়তো রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্ন বড়-অর্থনীতি, বিনিয়োগ, আইনশৃঙ্খলা, অবকাঠামো, কর্মসংস্থান। কিন্তু আমার মতো একজন মানুষের রাষ্ট্রের কাছে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটা খুব সাধারণঃ আমি কি এই রাষ্ট্রের একজন পূর্ণ নাগরিক?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি নির্বাচনের আগে বলেছিলেন, আপনার সরকারের একটি পরিষ্কার পরিকল্পনা আছে। সরকার গঠনের পর বলেছেন, আপনার সরকারের লক্ষ্য সমতা, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা। তাই আজ আমি জানতে চাই সেই পরিকল্পনায় আমি কোথায়? আমাদের জায়গাটা কোথায়? আমার মতো হাজার হাজার ট্রান্সজেন্ডার ও লিঙ্গ-বৈচিত্র্যময় মানুষ, হিজড়া জনগোষ্ঠী, সমকামী মানুষ, কুইয়ার মানুষ যারা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে ভয় পায়, যারা পরিবার হারানোর ভয়ে নিজের পরিচয় লুকিয়ে রাখে। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, কিন্তু হঠাৎ “সমকামী” তকমা লাগিয়ে তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক বিচার শুরু হয়ে যায়। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকে, কিন্তু একদিন জানতে পারে তাদের থাকার অধিকারও নাকি তাদের যৌন পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল। আপনার সেই পরিকল্পনায় এই মানুষগুলো কোথায়?
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে “সমকামিতা” অভিযোগকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বহিষ্কার ও আসন বাতিলের মতো ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। আমি আপনাকে প্রশ্ন করতে চাই একজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ব্যক্তিগত পরিচয় বা যৌন অভিমুখিতা কখন থেকে তার শিক্ষা গ্রহণের অধিকার কেড়ে নেওয়ার কারণ হয়ে গেল? কোন আইন বলছে যে কোনো ছাত্রকে “সমকামী” বলে চিহ্নিত করা হলে তার হলের বিছানা, তার পড়াশোনা, তার ভবিষ্যৎ সবকিছু কেড়ে নেওয়া যাবে? আর যদি আইন তা না বলে থাকে, তাহলে কারা এই ক্ষমতা নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছে? রাষ্ট্র কি তাদের থামাবে? নাকি রাষ্ট্র নীরবে দেখবে?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শাহবাগে আমরা দেখেছি কীভাবে একদল মানুষ কুইয়ার এবং ট্রান্স মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা করেছে। শুধু শাহবাগ নয়, সাম্প্রতিক সময়ে হিজড়া জনগোষ্ঠীর মানুষের ওপর ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনাও সামনে এসেছে। রাতে হিজড়া বা ট্রান্সজেন্ডার কোনো নারীকে দেখলেই তাকে যৌনকর্মী তকমা দিয়ে হামলা করা হচ্ছে, কারও কারও জামাকাপড় টেনে ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। আমি জানি, এসব ঘটনার প্রতিটির পেছনে আলাদা আলাদা অভিযোগ, দ্বন্দ্ব বা অপরাধের বর্ণনা থাকতে পারে। কিন্তু আমি আরেকটি জিনিস জানি-আমাদের জীবন এত সস্তা হয়ে গেছে যে আমাদের ওপর সহিংসতা ঘটলেও সমাজের বড় একটা অংশ সেই সহিংসতাকে নিন্দা করার বদলে সেটাকে যেন আমাদের প্রাপ্য শাস্তি হিসেবেই দেখে। আমরা যেন নাগরিক নই। আমরা যেন কারও সন্তান নই। আমরা যেন কারও ভাই-বোন নই। আমরা যেন কোনো পরিবারের সদস্য নই। আমরা যেন শুধু একটি পরিচয়, একটি শরীর’ একটি বাঁধাধরা ধারণা। একটি লক্ষ্যবস্তু।
আপনি কি কখনো ভেবেছেন, আপনার পরিবারে যদি আমার মতো একজন ট্রান্সজেন্ডার মেয়ে জন্মাত তাহলে কী করতেন? আমি জানি, এই প্রশ্নটি ব্যক্তিগত। কিন্তু আমার জীবনও তো ব্যক্তিগত। আমার ভয়, আমার মায়ের কান্না, আমার ভাইয়ের অসহায়ত্ব, আমাকে নিয়ে আমার পরিবারের প্রতিদিনের দুশ্চিন্তা সবই ব্যক্তিগত। কিন্তু যখন আমার পরিচয়ের কারণে আমাকে ভয় নিয়ে বাঁচতে হয়, যখন সমাজ আমার নিরাপত্তা কেড়ে নিতে চায়, তখন সেই ব্যক্তিগত কষ্ট আর শুধু আমার পরিবারের কষ্ট থাকে না। তখন প্রশ্নটা এসে দাঁড়ায় এই রাষ্ট্র কি আমাকে, একজন নাগরিক হিসেবে, নিরাপদে বাঁচার অধিকার দিচ্ছে?
আপনি তো একজন বাবা ও। আপনার মেয়েকে ঘিরে যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটূক্তি, ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা হয়রানি হয়েছে, তখন সেই অভিজ্ঞতাকে শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দেখা সম্ভব নয়, একজন বাবা হিসেবেও সেটি নিশ্চয়ই আপনাকে স্পর্শ করেছে। একজন বাবা হিসেবে তখন আপনার মনে হয়তো একটাই প্রশ্ন এসেছে; আমার মেয়েকে এভাবে অপমান করার অধিকার কে দিল? আমি আপনাকে শুধু সেই প্রশ্নটা একবার আমার জায়গা থেকে ভাবতে বলছি। যখন আমাকে রাস্তায় অপমান করা হয়, তখন আমার বাবার মনে কী চলে, সেটা কি আপনি কখনও ভেবেছেন? যখন আমার পরিচয়ের কারণে আমি কোন চাকরি থেকে বঞ্চিত হই, তখন আমার মা কী অনুভব করেন? আমি রাতে বাড়ি ফিরতে দেরি করলে আমার ভাই কী দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকে? আপনি একজন বাবা হিসেবে নিশ্চয়ই বুঝতে পারেন, সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে ভয় পাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। সেই ভয় কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বোঝে না, কোনো সামাজিক শ্রেণি বোঝে না, কোনো লিঙ্গপরিচয় বোঝে না। আপনার মেয়ের জন্য যে নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ আপনি একজন বাবা হিসেবে চাইবেন, একজন ট্রান্সজেন্ডার মেয়ের বাবা-মাও ঠিক সেটাই চান। তাই আমি আপনাকে শুধু একবার ভাবতে বলছি-যদি ট্রিয়ানা আপনার মেয়ে হতো, তাহলে তার জন্য আপনি কেমন বাংলাদেশ চাইতেন?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি আপনার কাছে করুণা চাই না। সত্যি বলতে, করুণা আমার প্রয়োজনও নেই। আমার প্রয়োজন অধিকার। এমন অধিকার, যা একজন নাগরিক হিসেবে আমার প্রাপ্য। আমি চাই না রাষ্ট্র আমাকে দয়া করে একটি চাকরি দিক; আমি চাই, আমার যোগ্যতা দিয়ে চাকরি পাওয়ার পথে আমার লিঙ্গপরিচয় যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। আমি চাই না আমাকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হোক, শুধু ট্রান্সজেন্ডার হওয়ার কারণে কেউ আমাকে অন্য সবার চেয়ে বেশি সুযোগ দিক, আমি শুধু চাই, আমাকে অন্য সবার চেয়ে কম সুযোগ না দেওয়া হোক। আমি চাই, আমার যোগ্যতাকে আমার পরিচয়ের চেয়ে বড় করে দেখা হোক। আমি চাই, কোনো ইন্টারভিউ কক্ষে ঢোকার পর আমার শরীর বা লিঙ্গপরিচয় নয়, আমার কাজের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করা হোক। আমি চাই না আমার শরীর মানুষের কৌতূহলের বিষয় হয়ে উঠুক, আমার পরিচয় আমার বিরুদ্ধে কোনো অদৃশ্য প্রমাণ হয়ে দাঁড়াক, কিংবা প্রতিটি নতুন জায়গায় গিয়ে আমাকে আবারও প্রমাণ করতে হোক যে আমিও একজন মানুষ। আপনি জানেন, কখনও কখনও আমার মনে হয়, একজন সাধারণ নাগরিকের জীবনে যে বিষয়গুলো স্বাভাবিকভাবে পাওয়ার কথা, সেগুলো পাওয়ার জন্য আমাকে যেন প্রতিবার আলাদা করে দরকষাকষি করতে হয়। নিরাপত্তা, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, কাজ এসব তো কোনো বিশেষ অধিকার নয়। এগুলো আমার মৌলিক প্রয়োজন। তাহলে এগুলো পাওয়ার জন্য আমাকে কেন বারবার নিজের অস্তিত্বের ব্যাখ্যা দিতে হবে? কেন আমার লিঙ্গপরিচয়ের কারণে আমাকে এমন একটি জীবন মেনে নিতে হবে, যেখানে প্রতিটি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আগে আমাকে প্রমাণ করতে হবে যে আমি সেই দরজার ভেতরে ঢোকার যোগ্য?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি বহু বছর দেশের বাইরে থেকেছেন, থাকতে আপনি বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু আপনি এমন একটি দেশে থেকেছেন, যেখানে লিঙ্গ-বৈচিত্র্যময় এবং এলজিবিটিকিউআইএ+ মানুষদের অধিকার, নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তি নিয়ে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে বহু ধরনের বিতর্ক, নীতি ও উদ্যোগ রয়েছে। আপনি নিশ্চয়ই দেখেছেন একটি আধুনিক রাষ্ট্র কীভাবে তার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নকে গুরুত্ব দেয়। তাহলে বাংলাদেশে ফিরে এসে আপনি কি আমাদের জন্য সেই প্রশ্নটি করবেন না? আপনি কি আপনার প্রশাসনকে বলবেন না যে“এই মানুষগুলোও আমার নাগরিক”? আপনি কি পুলিশকে বলবেন না-কেউ ট্রান্সজেন্ডার বা হিজড়া হলেই সে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক নয়? আপনি কি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বলবেন না-কোনো শিক্ষার্থীকে তার যৌন অভিমুখিতা বা জেন্ডার এক্সপ্রেশনের জন্য হেনস্তা, অপমান বা শিক্ষাজীবন থেকে বঞ্চিত করা যাবে না? আপনি কি শ্রমবাজারকে বলবেন না-যোগ্যতার জায়গায় পরিচয়কে বৈষম্যের হাতিয়ার করা যাবে না? আপনি কি সমাজকে অন্তত একবার বলবেন না যে “সে ট্রান্সজেন্ডার হোক, হিজড়া হোক, সমকামী পুরুষ হোক, সমকামী নারী হোক, কুইয়ার হোক সে বাংলাদেশের একজন নাগরিক”? আর একজন নাগরিক হিসেবে তার বেঁচে থাকার অধিকার আছে। তার নিরাপত্তার অধিকার আছে। তার সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। তার শিক্ষা গ্রহণের অধিকার আছে। তার কাজ করার অধিকার আছে। তার চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার আছে। তার বিয়ে করে একজন জীবনসঙ্গী পাওয়ার অধিকার আছে। তার নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে। এই সহজ কথাগুলো কি আপনি একবার দেশের মানুষকে বলবেন না?
আপনার সরকার একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশের কথা বলে। সেই কথা শুনে আমার মনে খুব স্বাভাবিক একটি প্রশ্ন জাগে-আমার সঙ্গে যে বৈষম্য প্রতিদিন ঘটে, তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কবে দাঁড়াবে? আপনি আইনের শাসনের কথা বলেন; কিন্তু যখন কোনো উগ্র জনতা আমার পরিচয়কে কেন্দ্র করে আমার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন সেই আইনের সুরক্ষা আমার জন্য কোথায়? আপনি সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন। তাহলে আমি কি সেই সাধারণ নাগরিকের মধ্যেই পড়ি না? নাকি “সাধারণ নাগরিক” শব্দটির ভেতরেও আমাদের মতো মানুষের জন্য একটি অদৃশ্য টীকা আছে-যেখানে লেখা আছে, তোমরা নাগরিক ঠিকই, কিন্তু তোমাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা আর অধিকার অন্যদের মতো পুরোপুরি নয়?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি একজন অধিকারকর্মী। তাই আমি এই চিঠি শুধু নিজের জন্য লিখছি না। আমি সেই ট্রান্সজেন্ডার মেয়েটির জন্য লিখছি, যে এখনও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শরীর আর নিজের পরিচয়ের সঙ্গে একটা স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা করছে। আমি সেই তরুণটির জন্য লিখছি, যে নিজের যৌন অভিমুখিতা কাউকে বলতে পারে না, কারণ সে জানে সত্যিটা প্রকাশ হয়ে গেলে হয়তো নিজের পরিবার, নিজের ঘর, এমনকি নিজের নিরাপত্তাটুকুও হারাতে পারে। আমি সেই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর জন্য লিখছি, যার বিরুদ্ধে “সমকামী” তকমা লাগিয়ে তার ব্যক্তিগত জীবনকে সামাজিক বিচারের বিষয় বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি সেই হিজড়া মানুষটির জন্য লিখছি, যার সামনে জীবিকার সুযোগ এত সীমিত যে তাকে নিজের মর্যাদার সঙ্গে প্রতিদিন আপস করতে হয়। আমি সেই হিজড়া যৌনকর্মীর জন্যও লিখছি, যার শরীরকে সমাজের একাংশ প্রয়োজনমতো ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু সেই মানুষটির নিরাপত্তা, মর্যাদা কিংবা জীবনের মূল্য নিয়ে কথা বলতে চায় না। আমি সেই মায়ের জন্য লিখছি, যিনি নিজের সন্তানকে নিয়ে প্রতিদিন ভয় পান। আমি সেই বাবার জন্যও লিখছি, যিনি জানেন না তার ট্রান্সজেন্ডার সন্তান রাতে নিরাপদে ঘরে ফিরবে কি না। আর আমি আমার জন্যও লিখছি। কারণ সত্যি বলতে, আমি ক্লান্ত। প্রতিদিন নিজের পরিচয় ব্যাখ্যা করতে করতে ক্লান্ত। মানুষকে বোঝাতে বোঝাতে ক্লান্ত যে আমি কোনো হুমকি নই, কোনো অপরাধী নই, কারও ক্ষতি করতে চাই না। সবচেয়ে বেশি ক্লান্ত এই কারণে যে, আমাকে বারবার বোঝাতে হয় আমি একজন মানুষ এবং আমার জীবনটাও অন্য সবার জীবনের মতোই মূল্যবান।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি শুধু বেঁচে থাকতে চাই না। আমি চাই নিজের পছন্দের কাজ করতে, নিজের উপার্জনে নিজের জীবন গড়ে তুলতে, নিজের একটা ঘর করতে। আমি চাই ভালোবাসতে এবং ভালোবাসা পেতে, একজন মানুষকে পাশে নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে, একদিন নিজের একটা সংসার করতে। আমি শিক্ষক হতে পারি, আইনজীবী হতে পারি, সাংবাদিক হতে পারি, চিকিৎসক হতে পারি, উদ্যোক্তা হতে পারি, সরকারি কর্মকর্তা হতে পারি, শিল্পী হতে পারি, অধিকারকর্মী হতে পারি। কিন্তু এসব পরিচয়ের যেকোনো একটিতে পৌঁছানোর আগে কেন আমাকে প্রথমে ট্রান্সজেন্ডার হিসেবে বিচার করা হবে? কেন আমার লিঙ্গপরিচয় আমার যোগ্যতার চেয়ে বড় হয়ে যাবে? কেন একজন সাধারণ নাগরিকের মতো নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করার জন্য আমাকে প্রতিটি ধাপে এত বেশি বাধা পার হতে হবে? আমার জীবনের আকাঙ্ক্ষা কি সত্যিই শুধু এতটুকু হবে যে, আজকে যেন কোনোভাবে নিরাপদে ঘরে ফিরি?
কিন্তু আমি এর চেয়ে বেশি কিছু চাই। আমি শুধু এমন একটা জীবন চাই না, যেখানে প্রতিদিন রাতে নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারাটাই সাফল্য। আমি এমন একটা জীবন চাই, যেখানে আমার লিঙ্গপরিচয়ের বাইরে আমার আরও অনেকগুলো পরিচয় থাকবে। আমি একজন মেয়ে, একজন সন্তান, একজন বন্ধু, একজন পেশাজীবী, হয়তো একদিন কারও জীবনসঙ্গী। আমি চাই আমার মা-ভাই আমাকে নিয়ে সারাক্ষণ ভয় না পেয়ে আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখুক। আমি চাই সমাজে আমার অবদান থাকুক, আমার কাজ দিয়ে মানুষ আমাকে চিনুক। আমি চাই আমার জীবনটা শুধু বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গল্প না হয়ে, আনন্দ, ভালোবাসা, কাজ, সম্পর্ক, পরিবার, স্বপ্ন আর অর্জনেরও গল্প হোক। আমি শুধু বেঁচে থাকার অধিকার চাই না; আমি এমনভাবে বাঁচার অধিকার চাই, যেভাবে একজন মানুষ তার জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তুলতে পারে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি যদি সত্যিই এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চান, যেখানে সমতা, ন্যায়বিচার এবং পারস্পরিক সম্মান শুধু রাজনৈতিক ভাষনের শব্দ না হয়ে মানুষের জীবনের বাস্তবতা হয়, তাহলে আমাদের নিয়ে রাষ্ট্রকে আর নীরব থাকা যাবে না। কে আমাকে গ্রহণ করবে, কে করবে না সেটা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কেউ আমাকে পছন্দ নাও করতে পারে, আমার পরিচয় বুঝতে নাও পারে, এমনকি আমার জীবনযাপনকে নিজের মূল্যবোধের সঙ্গে মেলাতেও না পারে। এতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু কেউ যেন আমাকে অপছন্দ করার কারণে আমার অধিকার কেড়ে নিতে না পারে, আমার ওপর সহিংসতা চালাতে না পারে, আমাকে শিক্ষা, কাজ, চিকিৎসা কিংবা নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত করতে না পারে এটা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আমার দরকার বাস্তব নিরাপত্তা। বৈষম্যের বিরুদ্ধে কার্যকর সুরক্ষা। কর্মসংস্থানে সমান সুযোগ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পরিবেশ। স্বাস্থ্যসেবায় মর্যাদা। পুলিশের কাছে অভিযোগ করার সময় সমান গুরুত্ব ও নিরাপত্তা। উগ্র জনতার সহিংসতার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান রাষ্ট্রীয় অবস্থান। ট্রান্সজেন্ডার, হিজড়া এবং যৌন সংখ্যালঘু মানুষের বিরুদ্ধে সহিংসতার প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার। আমি চাই না রাষ্ট্র মানুষকে নির্দেশ দিক আমাকে ভালোবাসতে, আমাকে পছন্দ করতে কিংবা আমাকে গ্রহণ করতে। আমি চাই রাষ্ট্র শুধু নিশ্চিত করুক-কেউ আমাকে অপছন্দ করার কারণে আমার অধিকার কেড়ে নিতে পারবে না।
তাই আমি চাই, আপনি একদিন খুব সহজ ভাষায় শুধু এই কথাটুকু বলুন- “তোমরা একা নও। এই রাষ্ট্র তোমাদেরও।” আমরা চাই, আমাদের রাষ্ট্র অন্তত একদিন স্পষ্ট করে বলুক “তোমাদের জীবনও আমাদের কাছে সমান মূল্যবান। তোমরা এই দেশের নাগরিক এবংতোমাদের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তোমাদের অধিকার রাষ্ট্র রক্ষা করবে।”
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সবশেষে আমি আপনাকে কোনো উত্তর দিতে বলছি না। আমি শুধু চাই, আপনি একবার নিজেকে এই প্রশ্নটি করুন “এই বাংলাদেশে একজন ট্রান্সজেন্ডার মেয়ে যদি আমার নিজের মেয়ে হতো, আমি কি চাইতাম সে নিজের পরিচয়ের কারণে ভয় নিয়ে বাঁচুক?” আমি মনে করি, আপনার উত্তর হবে-না। তাহলে সেই “না”-টিকে রাষ্ট্রীয় নীতির একটি অবস্থানে পরিণত করুন। কারণ আমি আপনার কাছে কোনো দয়া চাইছি না। আমি আমার অস্তিত্বের বৈধতাও চাইছি না। আমি শুধু একজন নাগরিক হিসেবে আমার রাষ্ট্রের কাছে আমার প্রাপ্যটুকু চাইছি-নিরাপদে ও সম্মানের সঙ্গে বাঁচার অধিকার, নিজের পরিচয় নিয়ে বাঁচার অধিকার এবং নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুযোগ। তাই আমার শেষ প্রশ্নটি খুব ছোট-
“মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি কি আমাকে আমার নিজের দেশেই নিরাপদে, সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে একটু সাহায্য করবেন?”
আপনার সুস্বাস্থ্য ও মঙ্গল কামনা করি।
ইতি,
ট্রিয়ানা নয়নতারা হাফিজ
ট্রিয়ানা নয়নতারা হাফিজ একজন ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্কার, অ্যাক্টিভিস্ট এবং মডেল।
