দুই শিফট উপাখ্যান: নারীর অদৃশ্য শ্রম বনাম সমাজ

Posted by

·

লিখেছেন শামা মেহজাবিন

“মানুষ নারী হিসেবে জন্মায় না, বরং গড়ে ওঠে।” – সিমোন দ্য বোভুয়ার

আমাদের সমাজে মেয়েদের ছোটবেলা থেকেই ঘরের কাজকর্ম শেখানো হয়ে থাকে। ঘরের কাজ যেন তাদেরই দায়িত্ব, আর ছেলেদের দায়িত্ব শুধু অর্থ উপার্জন করা। ফলতঃ বিশ্বজুড়ে নারীরা পুরুষদের তুলনায় গড়ে তিনগুণ বেশি গৃহকর্ম করে থাকেন। Oxfam এর ২০২০ সালের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, নারীদের এই অবৈতনিক গৃহকর্মের আর্থিক মূল্য হয়ে দাঁড়ায় বছরে প্রায় ১০.৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু এই সুবিশাল অবদানের বিনিময়ে তারা কতটুকু স্বীকৃতি পান?

নারীদের অদৃশ্য পরিশ্রমেই আমাদের জীবন সুন্দর হয়ে ওঠে। ঈদ, পূজাপার্বণ, বড়দিন ইত্যাদি বিভিন্ন উৎসবে যে অপার্থিব আনন্দ আমরা অনুভব করি, তার পেছনে কাজ করে আমাদের পরিবারের নারীদের পার্থিব শ্রম। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, ঈদের দিন সকালে বাড়ির পুরুষরা রওনা দেন মসজিদে, আর নারীরা ঢুকে যান রান্নাঘরে। নামায শেষে মুসল্লীরা বাড়ি ফিরে পান গরম গরম সুস্বাদু খাবার আর এর পেছনে নীরব পরিশ্রম দিয়ে যান নারীরা। অনেক এলাকায় এখনও নারীদের মসজিদে ঈদের নামায পড়ার সুযোগ নেই, ফলে ঈদের সকালটা তাদের রান্নাঘরেই কাটে। পুরুষদের মতো জামায়াতে নামায পড়া, সুহৃদদের সাথে কোলাকুলি করার অনাবিল আনন্দ থেকে তারা বঞ্চিত। তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়ালো—পুরুষের আনন্দ ঘোরাফেরায়, বন্ধুবান্ধবদের সাথে দেখাসাক্ষাতে, আর নারীর আনন্দ রান্নাঘরে? এই জীবন কি নারী নিজে বেছে নিয়েছেন, নাকি তার উপরে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে?

ইদানীং আমরা প্রায়ই শুনছি যে নারীরা ঘরের রানী, আর স্বামী-সন্তানের যত্ন নেয়া যে একটি মহান কাজ সেকথা তো বরাবরই মেয়েদের শেখানো হয়ে আসছে। অথচ মজার ব্যাপার হল, যারা এই কর্মবিভাজন রক্ষা করতে চান, তারাই আবার একই কারণে নারীকে দুর্বল ভাবেন এবং সুযোগ পেলেই অপমানের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। মেয়েরা কোনো ব্যাপারে মতামত দিতে গেলে, “মেয়ে মানুষ এত বুঝবে না” বা “মেয়ে মানুষের বুদ্ধি কম,” ইত্যাদি বলে তাদের চুপ করানোর চেষ্টা করা হয়। অনেক সময় পুরুষদেরও অপমান করার সময় তাদেরকে নারীদের সাথে তুলনা করা হয়, যা দেখায় যে নারীত্ব জিনিসটাই এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চোখে অপমানজনক। অর্থাৎ, যারা মুখে বলেন ঘরসংসার করা খুব সম্মানের, নারীকে তারা খুব সম্মান করেন—তারাই ভেতরে ভেতরে এরূপ বিশ্বাস লালন করেন না।

সে যাই হোক, এখন একটু অর্থনৈতিক কথাবার্তা বলি। বর্তমানে নারী-পুরুষ উভয়ই অর্থ উপার্জন করছেন। বিবিএসের Labour Force Survey 2022 অনুযায়ী, দেশে কর্মক্ষম নারীদের মধ্যে প্রায় ৪২ শতাংশই কোনো না কোনো আয়মূলক কাজে যুক্ত। অথচ একজন পুরুষ যেখানে কর্মক্ষেত্র থেকে ঘরে ফিরে বিশ্রাম নিতে পারেন, সেরকম একজন নারী পারেন না। তাকে সারাদিন কর্মক্ষেত্রে খাটুনি শেষে বাড়ি ফিরে আবার ঘরের কাজকর্ম করতে হয়। আরলি রাসেল হকশিল্ডের ভাষায়, “নারীরা অফিস বা কারখানায় এক শিফট কাজ করেন, আর ঘরে এসে করেন আরেক শিফট।”

আমরা খেয়াল করলে দেখবো, বিয়ের পরে এদেশের পুরুষদের কাজ কমে যায়। কারণ একজন অবিবাহিত পুরুষকে যেই কাজগুলো নিজের হাতে করতে হয় বা কাউকে বেতন দিয়ে করিয়ে নিতে হয়, বিয়ের পর সেই কাজগুলো তার স্ত্রী বিনামূল্যে করে থাকেন। সে কারণেই দেখা যায় বউ কিছুদিন বাপের বাড়ি গিয়ে থাকলে বরকে যারপরনাই দুর্দশায় পড়তে হয়। বউ থাকা অবস্থায় তার পরিশ্রম যতটা অদৃশ্য, সে চলে যাওয়ার পর সেটা ততটাই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। পক্ষান্তরে, বিয়ের পরে নারীর দায়িত্ব বেড়ে যায়। বিয়ের আগে তিনি যেই কাজগুলো শুধু নিজের জন্য করতেন, বিয়ের পরে সেগুলো স্বামী এবং স্বামীর পরিবারের জন্যও করতে হয়। আর সন্তান জন্মালে তো কথাই নেই—কাজ তখন আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এজন্যই বিয়ে এবং সন্তান জন্মের পর অনেক নারী লেখাপড়ায় পিছিয়ে পড়েন। বিশ্বব্যাংক ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বিয়ের পর মাত্র ২৮–২৯% নারী পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেন যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব খুবই সীমিত। তার মানে বিয়ে দুইজনেরই হচ্ছে, সন্তান উভয়েরই, অথচ ক্ষতি হচ্ছে একা নারীর—বিষয়টা বেশ মজার না?

আবার দেখুন, একজন ব্যাচেলর পুরুষ নিজের হাতে রান্না করছেন, ঘর ঝাড়পোঁছ করছেন—এটাকে আমাদের সমাজে খুবই করুণ কিংবা হাস্যকর (যখন যেটাতে সুবিধা হয় আর কি) একটা ব্যাপার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অথচ একই কাজ যখন নারী প্রতিনিয়ত করে থাকেন, হোক সে ব্যাচেলর বা বিবাহিতা, তখন কারও কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। যেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কেন এই দ্বিচারিতা? পুরুষের জন্য যেটা কষ্টকর, নারীর জন্য কি সেটা কষ্টকর নয়?

নারীরা এখন সবখানে বিচরণ এবং অর্থ উপার্জন করছেন। অথচ পুরুষরা এখনও আগের যুগেই পড়ে আছেন—তারা এখনও রান্নাবান্না, ঘর পরিষ্কার রাখা, জামাকাপড় কাচা ইত্যাদির জন্য নারীদের উপরে নির্ভরশীল। নারী ঘরে-বাইরে সব কাজ করলেও পুরুষ এখনও ঘরের কাজ করতে অপারগ। অর্থাৎ নারীকে স্বাবলম্বী করার চাইতে এখন পুরুষকে স্বাবলম্বী করাটা বেশি প্রয়োজন।

পরিবর্তনের সময় এসেছে। ঘরের কাজের জন্য নারীদের উপরে নির্ভরশীল না থেকে পুরুষের নিজেরও দায়িত্ব ভাগ করে নেয়া দরকার। “পুরুষরা তো অর্থ উপার্জন করে” এই কথা বলে তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ নারীরাও অর্থ উপার্জন করেন। নারীরা যদি কর্মক্ষেত্র থেকে ফিরে ঘরের কাজকর্ম করতে পারেন, তবে পুরুষদের তা করতে না পারার তো কোনো কারণ নেই। ঘর সবার, সেখানে কাজের দায়িত্বও সবার সমান সমান হওয়া উচিত নয় কি?

সমতা শুধু নারীদের কর্মক্ষেত্রে যোগদানের মাধ্যমে আসবে না, বরং পরিবারের মধ্যেও অধিকার ও দায়িত্বের সমবণ্টন হতে হবে। অবসর যেন একা পুরুষের না হয়ে নারীরও হয়, দায়িত্ব যেন একা নারীর না হয়ে পুরুষেরও হয়। নারী ঘরের কাজ করবে, পুরুষ বাইরের কাজ করবে—এই মেয়াদোত্তীর্ণ বিশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসার সময় এসেছে। ঘরে এবং বাইরে নারী, পুরুষ উভয়ের সমান অধিকার ও কর্তব্য নিশ্চিত করার মাধ্যমেই সমাজের উন্নতি সম্ভব। আর এই উন্নতির শুরুটা করতে হবে নিজের ঘর থেকেই।